• সোম. ডিসে ৫, ২০২২

অনিশ্চিত ২৩শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

অক্টো ২৭, ২০২২
অনিশ্চিত

অনিশ্চিত সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২৩শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প। ২ বছর আগে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

দ্বিতীয় মেয়াদেরও মাত্র ৭ মাস বাকি আছে। অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি। নামমাত্র কাজ করেই ২১৩ কোটি টাকার বিল নিয়ে গেছে ঠিকাদার।

৬ মাস ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পের মূল কাজ টার্মিনাল ও কার্গো ভবন নির্মাণের ১ শতাংশও শেষ হয়নি। অল্প কিছু পাইলিং ছাড়া এখনো কোনো ভবনই দৃশ্যমান হয়নি।

এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাও নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। এ অবস্থায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের ঠিকাদার চীনের বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ (বিইউসিজি) কর্তৃপক্ষের অভিযোগ-সব ধরনের নিয়মনীতি মেনে তাদের বিল

দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক); কিন্তু খোদ কর্তৃপক্ষের মনোনীত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কারণে তারা কাজ শুরু করতে পারছেন না।

১ বছর ধরে তারা বাধ্য হয়ে একাধিক বিদেশি প্রকৌশলীসহ অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বসিয়ে বসিয়ে বেতনভাতা দিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি তারা মন্ত্রণালয় ও বেবিচককে জানিয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তারা বেশ কয়েকটি মিটিং করেছেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।

গত শনিবারও দিনভর মিটিং হয়েছে। তিনি আশা করছেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ঘুস বাণিজ্য, খামখেয়ালিপনা ও একগুঁয়েমির কারণে ঠিকাদার কাজ শুরু করতে

পারছে না। কাজ শুরু করার জন্য ঠিকাদার ২১৩ কোটি টাকার বিল নিলেও তারা কাজ করতে পারছে না।

প্রকল্পের ওই লোক মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পান না।

এছাড়া তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিবের বন্ধু হওয়ায় কোনো কিছুই পরোয়া করেন না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুশাসনে বলা আছে, ওই পদের কর্মকর্তাকে অবশ্যই দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে। বেবিচকের বাস্তবায়নাধীন

প্রকল্পগুলো এভিয়েশন সেক্টরের সংশ্লিষ্ট বিধায় ওই পদে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে বেবিচকের নিজস্ব জনবল থেকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে

নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু অভিযোগ আছে, নিয়োগকৃত কর্মকর্তার এ ধরনের কোনো কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নেই। তিনি একজন বিসিএস

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। চাকরিজীবনে তার একমাত্র অভিজ্ঞতা হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ৭০টি গাড়ি কেনা।

সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, শুধু ওই কর্মকর্তার অনভিজ্ঞতার কারণে ২৩শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পটি এখন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোদ বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের মেগা প্রকল্পের

৭৫ ভাগ কাজ হচ্ছে পূর্তসংশ্লিষ্ট। বাকি ২৫ ভাগ কাজ ইলেকট্রিক্যাল-মেকানিক্যাল ও যোগাযোগ যন্ত্রাবলির। অথচ যে কর্মকর্তাকে নিয়োগ

দেওয়া হয়েছে, তিনি একজন মেকানিক্যাল ডিগ্রিধারী প্রকৌশলী।

এভিয়েশনসংক্রান্ত বিষয়ে তার কোনো কারিগরি জ্ঞান নেই। তাছাড়া তিনি পেশাগত জীবনের ২০ বছর আগে প্রকৌশল পেশা ত্যাগ করে সরকারের প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আইকাও (ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন)-এর

অ্যানেক্স-১৪-সহ অন্যান্য রুলস রেগুলেশন, এফএএ-এর (ফেডারেশন এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) অ্যাডভাইজরি সার্কুলারসংক্রান্ত দেশীয় ও

আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। তার বক্তব্য-মূলত এ ধরনের কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে তিনি প্রকল্প নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।

জানা যায়, ঘুস ছাড়া ওই কর্মকর্তা কোনো কেনাকাটার অনুমোদন দেন না।

নিয়ম হলো প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার লোকবল নিয়োগ করবে।এই নিয়োগেও তার বিরুদ্ধে বাগড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

৯ মাস আগে ঠিকাদার কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের জন্য বিদেশি প্রকৌশলী, একাধিক কর্মকর্তা ও বেশ কয়েকজন ড্রাইভার নিয়োগ করলেও ওই কর্মকর্তার অনুমোদন না পাওয়ায় তারা কাজ করতে পারছেন না।

গাড়ির ড্রাইভার নিয়োগেও তার অনুমোদন না দেওয়ার অভিযোগ আছে। শুধু তাই নয়, ওই কর্মকর্তা তার গাড়ির ড্রাইভারের বেতন এক লাখ

টাকা করার নির্দেশ দিয়েছেন ঠিকাদারকে। তা না মানায় ঠিকাদারের নিয়োগকৃত বিদেশি প্রকৌশলীকে অনুমোদন না দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ-তিনি ঠিকাদারের ভাড়া বাসায় থেকেও সরকারের কাছ থেকে বাসা ভাড়া নিচ্ছেন। এ অবস্থায় প্রকল্পের বিদেশি

ঠিকাদার বাকি কাজ করবেন না বলে হুমকি দিয়েছেন। এ নিয়ে গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছেন বেবিচকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

তারা বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

বিষয়টি ইতোমধ্যে লিখিতভাবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী যুগান্তরকে বলেন, এ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প।

তাছাড়া সিলেট বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের উন্নীত করার জন্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে।

কাজেই এ প্রকল্প নিয়ে কেউ কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি ও খামখেয়ালিপনা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রয়োজনে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করবেন বলেও জানান। বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করার কথাও তিনি জানান।

জানা যায়, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল

থেকে দেওয়া হবে ২২৭৪ কোটি টাকা। বাকি ৬১২ কোটি টাকা দেওয়া হবে বেবিচকের নিজস্ব তহবিল থেকে। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর

সরকার অনুমোদন দেয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর মেয়াদ ধরা হয়। মোট ৩২টি বিদেশি কোম্পানি এই প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নেয়।

প্রথম দফায় সব কোম্পানির দরপত্র বাতিল হয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায় ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেবার

মোট ১৯টি দরদাতা অংশ নেন। তাতে ৬টি প্রতিষ্ঠান যোগ্য বিবেচিত হয়। এরপর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এই প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে

বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপকে (বিইউসিজি)। অভিযোগ আছে, কার্যাদেশ পাওয়ার

পরই ওই কোম্পানির অন্তত এক ডজন বিদেশি বিশেষজ্ঞ সিলেটে নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা কাজ করতে পারছেন না।

বর্তমানে সিলেটে লন্ডন থেকে আসা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ করলেও রানওয়ের সক্ষমতা না থাকায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও পূর্ণ আসনের

যাত্রী নিয়ে উড্ডয়ন করতে পারছে না। নতুন প্রকল্পের আওতায় এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ফুয়েলিং সিস্টেম, অর্থাৎ সুবিশাল জেট-১ ফুয়েল ডিপো।

এই প্রকল্পের আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করা হবে। তাতে থাকবে নতুন বোর্ডিং ব্রিজ, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং

সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেমসহ অন্যান্য অত্যাধুনিক টার্মিনাল বিল্ডিং।

বিমানবন্দর টার্মিনালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই প্রকল্পের আওতায় পৃথক সাব-স্টেশন স্থাপনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এছাড়া বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম এবং স্বাচ্ছন্দ্যে টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম

অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাত্রী সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে লিফট এক্সকেলেটর, এয়ারপোর্ট সাইনেজ ও নজরদারি জোরদার করার জন্য সিসিটিভির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ফুয়েল হাইড্রান্ট সিস্টেম স্থাপন করা হবে।

এতে সব উড়োজাহাজ খুব সহজে ও নিরাপদে বিমানবন্দর থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে।

জানা যায়, গত ২ বছরে প্রকল্পের আওতায় প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবনসহ ল্যান্ডসাইড এলাকার শুধু মাটি খননকাজের কিছু অংশ শেষ হয়েছে।

কার্গো টার্মিনাল ভবনের বালি ভরাটকরণের কাজ চলমান।

কার্গো টার্মিনাল ভবনের ২৭২টি পাইলের মধ্যে সব, টার্মিনাল ভবনের ১৪৪৩টি পাইলের মধ্যে ৮১১টি, প্রশাসনিক ভবনের ১২৯টি পাইলের মধ্যে ১০৬টির কাজ শেষ হয়েছে।

মোট ১৯৩৮টি পাইলের মধ্যে ১২৮২টির কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া কার্গো টার্মিনাল ভবনের ৮৫টি পাইলের মধ্যে ৭৬টির ক্যাপ সম্পন্ন হয়েছে।

আরও আপডেট নিউজ জানতে ভিজিট করুন