• সোম. ডিসে ৫, ২০২২

আভ্যন্তরীণ চাহিদা ও ভারতের সঙ্গে কূটনীতিতে ইলিশ ব্যবহারে ভারসাম্য রাখতে হবে বাংলাদেশকে

সেপ্টে ৩০, ২০২২
ইলিশ

বাংলাদেশের পদ্মানদীর ইলিশ মাছ উচ্চ মানের, স্বাদে অতুলনীয়, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

প্রতি বছর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এই রাজ্যে দুর্গাপুজার সময় এর চাহিদা থাকে সর্বোচ্চ।

মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের মতো প্রতিবেশী দেশ ভারতে ইলিশ রপ্তানি করে।

গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে দেশীয় মাত্রায় ইলিশ উৎপাদিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখনই ভারত সফর করেন, তখনই ইলিশ রপ্তানির বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সেপ্টেম্বরে তার সাম্প্রতিক সফরের সময়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

তার চারদিনের দিল্লি সফরের একেবারে প্রথম দিনেই এই ইস্যুটি আলোচনায় উঠে এসেছে।

এর জবাবে ইলিশ মাছের প্রথম চালান ৬ই সেপ্টেম্বর কলকাতার বাজারে পৌঁছেছে। এদিনটি ছিল শেখ হাসিনার সরকারি সফরের তৃতীয় দিন।

বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে ইলিশ মাছ।

কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের সময় এই রূপালি মাছকে ব্যবহার করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি এ জন্য এই মাছ রপ্তানি করেছেন। আবার উপহারও পাঠিয়েছেন।

তিনি প্রথমবার ক্ষমতায় বসেন ১৯৯৬ সালে। তখন থেকেই এই চর্চা চলছে। ওই সময় তিনি পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুকে ইলিশ মাছ উপহার পাঠিয়েছিলেন।

গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি, ফারাক্কা বাঁধ থেকে পানি বন্টন চুক্তি হওয়ার আগে তিনি এই উপহার পাঠান। এই চুক্তি স্বাক্ষর হয় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে।

২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনন্দন বার্তা হিসেবে তাকেও উপহার হিসেবে পাঠানো হয় মূল্যবান এই মাছ।

এতে তখন এমনটাই ধারণা করা হয় যে, কলকাতা এবং ঢাকার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার।

তারা চাইছে দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির সমাধান করতে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, এ বছর ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারতে ২৪৫০ টন ইলিশ মাছ রপ্তানি করার কথা রয়েছে বাংলাদেশের।

তবে পদ্মার ইলিশের মজুদ বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে পর্যাপ্ত নয়।

এতে এই মাছের দাম বাংলাদেশের বাজারে বেড়ে গেছে। ফলে বিপুল পরিমাণ মাছ রপ্তানি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

উৎপাদন কম হওয়া ও তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির অগ্রগতির অভাবের কারণে ২০১২ সালে ঢাকা ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

তিস্তার পানি বন্টন ইস্যু ভারতে কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে মতবিরোধের কারণে আটকে আছে।

ওদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশে শাসক কর্তৃপক্ষ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি আইনগত নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

এতে ভারতে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করার বিষয়ে জানানো হয়েছে। অতীতে শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ ভারতে ইলিশ রপ্তানিতে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে।

২০২১ সালে ৪৬৪০ টন মাছের এক বিশাল কার্গোর চালান প্রবেশ করে ভারতে। গড়ে সাধারণত ৮০০ থেকে ১৪০০ রুপি দরে বিক্রি হয় এই মাছ। এতে বাংলাদেশ বড় অংকের রাজস্ব পায়।

এই কারণে প্রতি বছর দুর্গাপুজা শুরুর আগে জনপ্রিয় ও সুস্বাদু এই মাছ ভারতে রপ্তানি করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেন বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক রপ্তানিকারক।

ক্রমবর্ধমান হারে ইলিশ ধরা এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের মাছ আমদানিকারকরা মাঝে মাঝেই ঢাকার কাছে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার অনুরোধ করেন।

কারণ, পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বড় ইলিশ খুঁজে পাওয়াই কঠিন।

যদিও সম্প্রতি বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মাছের চালান পৌঁছেছে।

তবু হাসিনা সরকারের জন্য এতে আরও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জনপ্রিয় এই মাছের বেআইনি চোরাকারবারি।

ভারতে ইলিশের প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে অ্যাঙ্গারাইল, হাকিমপুর এবং হিলির স্পর্শকাতর সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে এসব মাছ প্রবেশ করে।

আগামী বছরেই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে হাসিনার সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে নিজের ভোটারদের আভ্যন্তরীণ ইলিশের চাহিদা ও ভারতের সঙ্গ কূটনৈতিক অর্জন নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

এক্ষেত্রে হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ইলিশ কূটনীতির চর্চা তার রাজনৈতিক ভাগ্যের প্রধান নির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

(লেখক কলকাতার অবজার্ভার রিসার্স ফাউন্ডেশনের সাবেক সহকারী গবেষক। তার এই লেখাটি অনলাইন দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত হয়েছে। সেখান থেকে অনুবাদ)

আরও আপডেট নিউজ জানতে ভিজিট করুন