• শনি. জানু ২৮, ২০২৩

দেশীয় প্রযুক্তিতে মেরামতের ১৫ দিনেই এক ইঞ্জিন নষ্ট, জ্বালানি খরচ উঠছে না

ডিসে ৬, ২০২২
দেশীয় প্রযুক্তিতে মেরামতের ১৫ দিনেই এক ইঞ্জিন নষ্ট, জ্বালানি খরচ উঠছে না

দেশীয় প্রযুক্তিতে মেরামতের ১৫ দিনেই এক ইঞ্জিন নষ্ট, জ্বালানি খরচ উঠছে না

বাংলাদেশ রেলওয়ে বলছে তারা দেশীয় পদ্ধতিতে সাশ্রয়ী মূল্যে অচল ডেমু ট্রেন মেরামত করে সচল করছে।

কিন্তু তাদের সচলকৃত এই ডেমু ট্রেন সচল করার ১৫ দিনের মাথায় দুটি ইঞ্জিনের একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে।

এখন কোনোরকমে একটি ইঞ্জিন দিয়ে এই ডেমু ট্রেন ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার গতিতে চালানো হচ্ছে।

এই ধীর গতির ফলে ডেমু ট্রেন তাদের নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে পারছে না। এর ফলে যাত্রী ও আয় কোনোটাই আশানুরূপ হচ্ছে না।

রেলওয়ে সূত্র বলেছে ট্রেনটি চালিয়ে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে ট্র্র্রেনটির জ্বালানি খরচেই হয় না।

মো: আসাদুজ্জামান নামে এক  প্রকৌশলীকে অচল ট্রেন সচল করার দায়িত্ব দেয় রেলওয়ে মেকানিক্যাল বিভাগ।

তিনি বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের হয়ে চাকরি করেন। ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ করে গত বছর এক সেট ডেমু ট্রেন সচল করা হয়।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন গত ৯ অক্টোবর দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে রংপুর পর্যন্ত পথে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডেমু ট্রেনের উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটার গতিতে ডেমু ট্রেনটি চালানো হচ্ছে।

ডেমু ট্রেনটি চালিয়ে ব্যয় উঠছে না:

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্বোধনের পর ডেমু ট্রেনটি ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিতে চলেছে।

গত ২৫ অক্টোবর একটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। সেটি এখনো বিকল আছে। ডেমু ট্রেনের দুইপাশে দুটি ইঞ্জিন।

এখন একটি ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেনটি ঘন্টায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার গতিতে চলছে।

ট্রেনটি দিনে দুইবার চলাচল করে। একবার রংপুর যায় এবং পুনরায় পার্বতীপুর ফিরে আসে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলেছে, ডেমু ট্রেনটি ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোটামুটি সময় মেনেই চলাচল করেছে।

কিন্তু ২৫ অক্টোবর একটি ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর পার্বতীপুর থেকে ৫৫ মিনিট দেরিতে ছাড়ে।

রংপুর থেকে ফেরার সময় এক ঘণ্টা বেশি দেরি করে। তারপর থেকে যাওয়া-আসায় প্রতিদিনই এক ঘণ্টা বা তারও বেশি দেরি করছে।এ ট্রেনের যাত্রীরা মূলত স্বল্প দূরত্বের।

তাদের অধিকাংশই অফিসগামী যাত্রী। আবার কেউ কেউ জরুরি কাজে যাতায়াত করেন।

ট্রেনের এ ধীর গতির কারণেও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। এরফলে ডেমু ট্রেনটি থেকে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে সেই ট্রেনের জ্বালানি খরচই মিটছে না।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ থেকে ট্রেনটির ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত যাত্রী ও আয়ের তথ্য পাওয়া গেছে।

এতে দেখা যায় যে, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত পার্বতীপুর থেকে রংপুর যাওয়ার পথে দিনে তিন বগির ট্রেনটিতে মাত্র ১ হাজার ৮১৫ জন যাত্রী পরিবহন করেছে।

অথচ ট্রেনটিতে বসার আসন রয়েছে ১৫০টি। আবার সমসংখ্যক যাত্রীর দাঁড়িয়ে যাওয়ার ও সুযোগ আছে।

যাতায়াতের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন ১৫ জন যাত্রী নিয়েও ট্রেনটি চলেছে।

৫০ জনের কম যাত্রী নিয়ে বেশিরভাগ দিনই চলেছে। ১ দিন সর্বোচ্চ ২০১ জন যাত্রী যাতায়াত করেছে।

অন্যদিকে রংপুর থেকে পার্বতীপু যাওয়ার সময় যাত্রী কিছুটা বেশি ছিল। এ পথে যাত্রী যাতায়াত করেচে ৬ হাজার ৬০২ জন।

তারমধ্যে সর্বনিম্ন ৩৮ জন এবং সর্বোচ্চ ২৩২ জন যাত্রী যাতায়াত করেছে। এই ডেমু ট্রেনটি চলেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের লালমনিরহাট বিভাগের অধীনে।

এই বিভাগের অন্য পথে রেলের লোকাল বা মেইল ট্রেনগুলোতে এর চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী যাতায়াত করে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রেলওয়ে সূত্র থেকে জানা গেছে, পার্বতীপুর-রংপুর পথে আয় হয়েছে ৩৫ হাজার ৭২৮ টাকা।

অন্যদিকে রংপুর-পার্বতীপুর পথে আয় হযেছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৮ টাকা।

অর্থাৎ ৫৩ দিনে আসা-যাওয়ায় মোট আয় হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৫৬ টাকা। প্রতিদিন গড়ে আয় ৩ হাজার ২৩৫ টাকার মতো।

ডেমু ট্রেনটি পরিচালনায় যুক্ত একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ট্রেনটির যাওয়া এবং আসায় কম হলেও ৭০ লিটার ডিজেল খরচ হয়।

প্রতি লিটার ডিজেলের মুল্য ১০৯ টাকা। সে হিসাবে দিনে জ্বালানির পেছনে ব্যয় দাঁড়ায় ৭ হাজার ৬৩০ টাকা।

এর সঙ্গে রেললাইন ব্যবহার, চালক ও কর্মচারীর বেতন, লাইন ব্যবহারের খরচ, দৈনন্দিন মেরামত হিসেবে নিলে ট্রেনটি চালিয়ে খরচের তিন ভাগের এক ভাগও উঠছে না।

মেরামতের পর আবার অচল:

২০ সেট ডেমু ট্রেন কিনতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এতে যাত্রী পরিবহন করে আয় হয়েছে ২২ কোটি টাকার মতো।

মেরামত ও জ্বালানির পেছনে আবার খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ফলে দেখা যাচ্ছে, জনগনের বিপুল অঙ্কের টাকা গচ্চা যাচ্ছে এই ডেমু ট্রেনের পেছনে।

আবার বারবার মেরামতের পরও অচল হয়ে পড়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় দেশীয় প্রযুক্তিতে একটি ডেমু মেরামত করার পর সব কটি ট্র্রেন মেরামতের উদ্যোগ নেয় রেলের মেকানিক্যাল বিভাগ।

এ লক্ষ্যে ২০ অক্টোবর ঢাকার রেলভবনে মেকানিক্যাল বিভাগ ও ডেমু সচল করার দায়িত্ব দেওয়া প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা করেন।

এ সময় রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: হুমায়ুন কবীর, রেলের মহাপরিচালক ডি এন মজুমদারসহ সংস্থাটির শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় জানানো হয প্রতি সেট ডেমু ট্রেন সচল করতে খরচ হবে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা।

এতে ২০ সেট ডেমুর পেছনে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা খরচ হবে। দরপত্র ছাড়াই দ্রুত ডেমু মেরামতের অনুমতি দেওয়ার জন্য মেকানিক্যাল বিভাগ রেলমন্ত্রীর কাছে আবেদন করে।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, মেরামতে কত ব্যয় হতে পারে একটি কমিটি তার ধারণা তৈরি করবে।

আবার রেলসচিব মনে করেন, মেরামতে উন্মুক্ত দরপত্র বা সরকারি বিধান মেনে করা দরকার।

রেলের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ঠিকাদার ও রেলের মেকানিক্যাল বিভাগের শীর্ষ  কর্মকর্তারা মিলে ডেমু ট্রেন মেরামতের বিষয়টি দ্রুত অনুমোদন দিতে চাপ দিচ্ছে।

তবে এভাবে মেরামত করলে ডেমু চলবে কিনা এর কোনো নিশ্চয়তা দিতে রাজি না।

কিন্তু মেরামতের পর ছয় মাস ঠিকঠাক চলাচল না করলে পুনরায় অর্থ ব্যয় করার কোনো মানে হয় না।

মেরামতের পর পার্বতীপুর-রংপুর পথে ডেমু চালুর পর একটি ইঞ্জিন বিকল হওয়া এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন প্রতি সেট ডেমু মেরামতে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা দেখাচ্ছে।

কিন্তু পরে ব্যয় এক কোটি বা এরও বেশি দেখালে কী করার আছে? রেলের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) অসীম কুমার তালুকদার বলেন, মেরামতের বিষয়টি মেকানিক্যাল বিভাগ বলতে পারবে।

ট্রেনে যাত্রী কম হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এখন পরীক্ষামুলকভাবে ৫০ কিলোমিটার এর মধ্যে চালাচল হচ্ছে।

এটিকে লালমনিরহাট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। তখন যাত্রী এবং আয় অনেক বেড়ে যাবে।

আরও আপডেট নিউজ জানতে ভিজিট করুন