• শনি. জানু ২৮, ২০২৩

শ্রীলঙ্কায় আইএমএফের জবরদস্তিমূলক নীতি

ডিসে ৩, ২০২২

শ্রীলঙ্কায় আইএমএফের জবরদস্তিমূলক নীতি

সেপ্টেম্বরের ১ তারিখে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমফের ঋণফাঁদের প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছে শ্রীলঙ্কা।

চার বছর পর্যন্ত পরিশোধযোগ্য ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন

ডলারের এই তহবিলে তাদের ‘অপরিশোধিত’ ঋণ যেমন

পরিশোধ হবে না; তেমনি জরুরি প্রয়োজনও পূরণ হবে

না। বরং, আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে

দেশটাকে আরও সর্বনেশে কিছু করতে হবে। যেমন

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারীকরণ, সামাজিক

নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিসর কমানো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

ও পশ্চিমা স্বার্থের সঙ্গে মিল রেখে স্থানীয় অর্থনৈতিক নীতি

গ্রহণ। এসব নীতির নেতিবাচক প্রভাব যে ইতোমধ্যে

সাধারণ শ্রীলঙ্কানদের ওপর পড়ছে, তা স্পষ্ট। একই সঙ্গে

দেশটির সার্বভৌমত্ব যেমন হুমকিতে, তেমনি এর ফলে

সেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়বে ও ঋণের সংকট পুনরায় দেখা দিবে।

২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কার বাজেটে দেশটির রাজস্ব আহরণের

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন

প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারীকরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

যেটি মূলত আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় ও

উদারীকরণ নীতির কারণেই হয়েছে। ২০২৩ সালের

শ্রীলঙ্কার বাজেটে বলা হয়েছে- ‘সরকার বর্তমানে ৪২০টি

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৮৬

বিলিয়ন রুপি তথা ২৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার

উৎপাদনকারী ৫২টি প্রতিষ্ঠান লোকসানে রয়েছে। সে জন্য

অর্থ মন্ত্রণালয়ে নতুন একটি বিভাগ চালু হয়েছে, যারা

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে কাজ

করছে। প্রাথমিকভাবে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্স, শ্রীলঙ্কা

টেলিকম, কলম্ব হিল্টন, ওয়াটারস এজ এবং শ্রীলঙ্কা

ইন্স্যুরেন্স করপোরেশন ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে

বেসরকারি মালিকানায় দেওয়া হবে। ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রুপি শক্তিশালী হবে।’

বামঘেঁষা ও জাতীয়তাবাদী বন্দরনায়েকে সরকার ১৯৫০-

এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭০-এর মাঝামাঝি পর্যায়ে

অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। এর মধ্যে অনেক

প্রতিষ্ঠানই দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে সংশ্নিষ্ট পণ্যের বৈদেশিক

আমদানি কমিয়েছিল। ১৯৭৭ সালে বাজার অর্থনীতির সূচনা

হওয়ার পর সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানাধীনে চলে যায়।

তখন থেকেই যে বেসরকারীকরণ তথা বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে, তা এখনও চলছে।

এর পরের সরকারগুলোর সময়ে সেগুলোকে ‘পাবলিক

প্রাইভেট পার্টনারশিপ-পিপিপির নামে বেসরকারীকরণ করা হয়।

শ্রীলঙ্কায় ২৮৭টি রাষ্টায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

আর রাষ্ট্রায়ত্ত অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮৫।

সেখানে ৫৫টি কৌশলগত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে দেশটির

শ্রমজীবীর ১ দশমিক ৯ শতাংশ কাজ করেন। রাষ্ট্রীয়

প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রীলঙ্কায় মোট ১৪ লাখ মানুষ কর্মরত।

এটি শ্রীলঙ্কার মোট শ্রমশক্তির ছয় ভাগের এক ভাগের বেশি।

অনেক শ্রীলঙ্কানই সরকারি চাকরিকে প্রাধান্য দেয়। কারণ

সেখানে যেমন চাকরির নিরাপত্তা রয়েছে, তেমনি চাকরি

থেকে অবসরের পর পেনশনসহ অন্য সুবিধা বিদ্যমান।

ফলে সেখানে এ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বেসরকারীকরণের

ফলে বেতন কমে যাবে এবং অনেকেই ছাঁটাইয়ের শিকার

হয়ে চাকরি হারাবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠান

তখন মানুষের সুবিধার চেয়ে নিজেদের মুনাফাকেই

প্রাধ্যান্য দেবে এবং সে অনুযায়ী সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

শ্রীলঙ্কায় ২৮৭টি রাষ্টায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

আর রাষ্ট্রায়ত্ত অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮৫।

সেখানে ৫৫টি কৌশলগত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে দেশটির

শ্রমজীবীর ১ দশমিক ৯ শতাংশ কাজ করেন। রাষ্ট্রীয়

প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রীলঙ্কায় মোট ১৪ লাখ মানুষ কর্মরত।

এটি শ্রীলঙ্কার মোট শ্রমশক্তির ছয় ভাগের এক ভাগের বেশি।

অনেক শ্রীলঙ্কানই সরকারি চাকরিকে প্রাধান্য দেয়। কারণ

সেখানে যেমন চাকরির নিরাপত্তা রয়েছে, তেমনি চাকরি

থেকে অবসরের পর পেনশনসহ অন্য সুবিধা বিদ্যমান।

ফলে সেখানে এ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, বেসরকারীকরণের ফলে

বেতন কমে যাবে এবং অনেকেই ছাঁটাইয়ের শিকার হয়ে চাকরি হারাবে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠান তখন মানুষের সুবিধার চেয়ে

নিজেদের মুনাফাকেই প্রাধ্যান্য দেবে এবং সে অনুযায়ী সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

শ্রীলঙ্কা বেসরকারীকরণের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্য প্রান্তের

দেশগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ২০১৬ সালে

নেদারল্যান্ডসের ট্রান্সন্যাশনাল ইনস্টিটিউট পরিচালিত

ইউরোপে বেসরকারীকরণের ওপর একটি গবেষণার

তথ্যমতে, প্রত্যাশিত রাজস্ব আহরণে ইউরোপে

বেসরকারীকরণ ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে শুধু লাভজনক

প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি হলেও ধীরে ধীরে তা মূল্য হারিয়েছে।

গবেষণায় এও বলা হয়েছে, যেসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ

করা হয়েছে, সেগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মতো এতটা দক্ষতা

দেখাতে পারেনি। বেসরকারীকরণের এ সংকটে পর্তুগাল, গ্রিস ও

ইতালির অনেক ইউরোপীয় জ্বালানি কোম্পানি চীনের কাছে বিক্রি

হয়ে গেছে। গবেষণাটি এও বলছে, ইউরোপে বেসরকারীকরণের

ফলে গ্রিস, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডের মতো দেশে

দুর্নীতি যেমন বেড়েছে, তেমনি স্বজনপ্রীতির চর্চাও দেখা গেছে।

বেসরকারীকরণে এ ধরনের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কায় স্থানীয়

প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা অর্থনৈতিক সংকটে

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাতে

দেশটির যে খুব লাভ হবে না, তাতে সন্দেহ সামান্যই।

এই বেসরকারীকরণের মধ্যে বেশি উদ্বেগ রয়েছে ভূমি নিয়ে।

সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ভূমি রয়েছে সবচেয়ে ঝুঁকিতে। শ্রীলঙ্কায়

এ দফায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভূমিকেও যেভাবে পণ্য

বানানো হচ্ছে, সেটিই মনে হচ্ছে বেসরকারীকরণের বড়

দিক। বলাবাহুল্য, এখানে শুধু ভূমিই নয়; জীবন ও

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সবচেয়ে অপরিহার্য উপাদান পানিও

বেসরকারীকরণের হুমকিতে রয়েছে। অবশ্য পণ্য হিসেবে

পানির ব্যবহার শুধু শ্রীলঙ্কাতেই নয়, বরং গোটা বিশ্বেই এখন দেখা যাচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম করপোরেশন কম্প্যাক্ট-

এমসিসির সাম্প্রতিক নব্য সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় শ্রীলঙ্কা

এখনও স্বাক্ষর করেনি। দরিদ্র বিমোচনের নামে এমসিসির

এজেন্ডা ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ শুরু করেছিলেন।

তবে শ্রীলঙ্কার বর্তমান সরকার স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের

চেয়ে রপ্তানির ওপর প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ভূমি বেসরকারীকরণের

দিকে ঝুঁকছে। এর মানে, এমসিসি এজেন্ডাই তারা বাস্তবায়ন করছে।

এর ফলে যে আমদানিকৃত খাদ্যের দাম বাড়বে এবং দেশ

খাদ্য সংকটে পড়বে; সেটি কি তারা অনুধাবন করছে না?

এ লক্ষ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব জনপরিসরে আলোচনা না করেই

শ্রীলঙ্কার ২০২৩ সালের বাজেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পার্লামেন্টের জাতীয়তাবাদী সদস্য ও কয়েকটি দল এ

বিষয়ে সমালোচনা করে বলেছে, ইচ্ছাকৃতভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত

ভূমি বেদখলের ব্যবস্থা করা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে

বেসরকারীকরণের ফলে যে ক্ষতি হবে, তা অপূরণীয়।

বিদ্যমান ভূমি সংস্কার কমিশনের সংস্কারের কথা বলে তারা

যেভাবে বিভাগীয় সচিবালয়গুলোকে ক্ষমতায়ন করছে,

তাতে ভূমি বিতরণে স্বজনপ্রীতি দেখা যাবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে

হচ্ছে, ২০২৩ সালের বাজেটে এমসিসি এজেন্ডা

বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। যদিও এর বিরোধিতায়

অ্যাক্টিভিস্টরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এটি নব্য ঔপনিবেশিক এজেন্ডা।

তাতে ভূমি দখলের মাধ্যমে মানুষকে উচ্ছেদ করা হবে

এবং কৃষকদের আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে রাষ্ট্রায়ত্ত ভূমি বেদখলের

বৈধতা দান ও রাষ্ট্র্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ বিষয়ে

যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সে ব্যাপারে তার বৈধতা নিয়ে জনপরিসরে

ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। তাঁর কিংবা তাঁর দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল

পার্টিকে মানুষ এ জন্য কোনো ম্যান্ডেট দেয়নি। ভূমি, বন্দর

ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক রাজনীতিকরা নন;

সাধারণ মানুষ এবং শ্রীলঙ্কার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সে জন্য

আইএমএফের নির্দেশনা মেনে সরকারের ‘গ্রেট শ্রীলঙ্কা

ফায়ার সেইল’ শুরু করার আগে জনগণকে বিকল্প কিছু ভাবা দরকার।

আরও আপডেট নিউজ জানতে ভিজিট করুন