• শুক্র. জুন ৯, ২০২৩

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: ‘মিশন সম্পন্নের’ দুই দশক পরেও যা করছে যুক্তরাষ্ট্র

মে ৪, ২০২৩

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: ‘মিশন সম্পন্নের’ দুই দশক পরেও যা করছে যুক্তরাষ্ট্র

দুই দশক আগে ২০০৩ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ

মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের ওপর দাঁড়িয়ে ইরাকে মূল সামরিক

অভিযান সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর পেছনে টাঙানো ব্যানারে লেখা ছিল ‘মিশন সম্পন্ন’।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর মাত্র ৪৩ দিনের মাথায় নাটকীয়

ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। বুশের ওই ঘোষণার মাধ্যমে বোঝানো

হয়েছিল, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের

শুরু করা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক যুদ্ধ’-এর একটি পর্ব শেষের সূচনা।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল অভিযান শেষ হওয়া থেকে অনেক দূরে। এরপরে যুক্তরাষ্ট্র

আরও সেনা পাঠাতে থাকে ইরাকে। সেখানে তাদের সেনার সংখ্যা সর্বাধিক হয় ২০০৭ সালে, ১ লাখ ৬৮ হাজার।

যদিও ২০০১ সালের ৯/১১ নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন ডিসিতে চালানো ওই সন্ত্রাসী হামলায় ইরাকের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য-প্রমাণ ছিল না।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র তার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করে। নিজেরা সামরিক

অভিযান ও হামলা চালানোর পাশাপাশি কখনো কখনো সহযোগী দেশের বাহিনী

দিয়ে ২০টির বেশি দেশে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয় তারা। নিজেদের নিরাপত্তার

জন্য যাদেরই হুমকি মনে করেছে, সেসব দেশেই কথিত এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ব্রেনান সেন্টার ফর জাস্টিসের লিবার্টি অ্যান্ড ন্যাশনাল

সিকিউরিটি কর্মসূচির পরামর্শক ক্যাথেরিন ইয়ন ইব্রাইট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান

প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ সব সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রশাসনগুলো ‘সন্ত্রাসের

বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নিয়ে যেসব কথা বলেছে ও কৌশল নিয়েছে,

সেগুলো পর্যালোচনা করলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ঘাটতি ধরা পড়বে।

ইব্রাইট বলেন, গত দুই দশকে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ‘ক্যানসারের মতো’

বিস্তৃত হওয়ায় জবাবদিহির ঘাটতি অব্যাহত থেকেছে। বিশেষত আফ্রিকা ও

এশিয়ার দেশে দেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ হয়েছে। এই লড়াই এভাবে বিস্তৃত

হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক অভিযান থেকে সরে আসাটা ভূমিকা রেখেছে।

ইব্রাইট বলেন, ‘কিছু বিষয় নিয়ে আমরা প্রকৃতপক্ষে কোনো কথা বলিনি। তাহলো কথিত

এসব শত্রুর পেছনে ছোটা কি আমাদের জন্য কোনো অর্থ তৈরি করে? আসলেই কি

এরা আমাদের শত্রু নাকি স্থানীয় স্বার্থের বিবেচনায় স্থানীয় বিভিন্ন গোষ্ঠী?’ তিনি বলেন,

আসলে গণতন্ত্রে এমন আগ বাড়িয়ে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো কার সঙ্গে যুদ্ধ করছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে, কেবল কংগ্রেসেরই যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা রয়েছে।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমনটি কখনো ঘটেনি। তার বদলে দেশটির নেতারা

যুদ্ধের ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য আইনি মারপ্যাঁচের পথে হেঁটেছে—বিশেষত এ

ক্ষেত্রে দেশটির অভ্যন্তরীণ আইন ব্যবহার করেছে। তাঁরা বহির্বিশ্বে তাঁদের সামরিক

অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘সন্ত্রাসীদের’ হুমকি মোকাবিলার বিষয় হিসেবে প্রচার করেছে।

যদিও তাঁদের এই আইনি ন্যায্যতার দাবি ধোপে টেকে না। বিশ্লেষকদের মতে, আসলে

তারা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুপক্ষগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাহী বিভাগ তথা হোয়াইট হাউস,

প্রতিরক্ষা বিভাগ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল ক্ষমতা ব্যবহার করে।

২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার ঘটনায় সামরিক অভিযানের জন্য

যুক্তরাষ্ট্রে দ্য অথরাইজেশন ফর ইউজ অব মিলিটারি ফোর্স (এইউএমএফ)

আইন গৃহীত হয়। এই আইনের সুযোগ নিয়ে কংগ্রেসের অনুমোদন

ছাড়াই সন্ত্রাস মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালাতে পারে।

২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর এইউএমএফ আইন পাস হয়। এই আইন মার্কিন

প্রেসিডেন্টকে ৯/১১ হামলার জন্য দায়ী দেশ, সংস্থা বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয়

শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট এককভাবে পরিকল্পনা সাজাতে,

সামরিক অভিযানের অনুমোদন দিতে, কোনো পক্ষের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

হতে ও সামরিক অভিযানে সাহায্যকারী দল নির্বাচন করতে পারবেন।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান এই আইনের মাধ্যমে বৈধতা পায়।

পরে আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেটসহ (আইএস) বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক

শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এই আইনকে ব্যবহার করা হয়। এই আইনের সংশোধনী

পাস হয় ২০০২ সালে। তার সুযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী সময়ে ইরাক ও সিরিয়ায় অভিযান চালায়।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি’ প্রকল্পের সহপরিচালক

স্টেফানি স্যাভেল ২০২১ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ওই প্রতিবেদনের

তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে জিবুতি, লিবিয়া, পাকিস্তান, সোমালিয়া ও ইয়েমেনসহ

বিভিন্ন দেশে মার্কিন বিমান হামলা এবং সামরিক অভিযানকে বৈধতা দিতে

এইউএমএফ আইন ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে ক্যামেরুন, চাদ, ইরিত্রিয়া,

জর্জিয়া, কসোভো, জর্ডান, নাইজেরিয়া ও ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে মিত্রদের

অভিযানে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই আইন ব্যবহার করা হয়।

শুধু ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল—এই দুই বছরে ওয়াশিংটন ৮৫টি দেশে এ ধরনের

‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কার্যক্রম চালিয়েছে। এসব কার্যক্রমের মধ্যে বিমান হামলা থেকে

শুরু করে সংশ্লিষ্ট দেশের সেনাবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়গুলোও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০১ সাল থেকে ২২টি দেশে অজ্ঞাতসংখ্যক বিমান হামলা,

সম্মুখযুদ্ধ, আটক করা ও মিত্র বাহিনীর সামরিক অভিযানে সহায়তা দেওয়ার

ক্ষেত্রে এইউএমএফের কথা উল্লেখ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসন।

তবে এই পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সম্পৃক্ততার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না বলে

জানিয়েছেন স্যাভেল। তাঁর বিশ্লেষণ মতে, শুধু ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল—এই

দুই বছরে ওয়াশিংটন ৮৫টি দেশে এ ধরনের ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কার্যক্রম চালিয়েছে।

এসব কার্যক্রমের মধ্যে বিমান হামলা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট দেশের সেনাবাহিনীকে

‘সন্ত্রাসবিরোধী’ প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়গুলোও রয়েছে। তিনি বলেন,

বাইডেন প্রশাসনের প্রথম এক বছরের কার্যকলাপও একই পথে হেঁটেছে।

স্যাভেল আল-জাজিরাকে বলেন, ২০১৫ সালে যখন তিনি এ গবেষণা শুরু করেন,

তখন ভেবেছিলেন ‘সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ কার্যক্রম সাত থেকে আটটি

দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু তিনি যত গভীরে যান ততই কী ঘটছে তার বিস্তৃতি

সম্পর্কে খোঁজ পান। স্যাভেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব কার্যক্রম কোনো সরকারি

ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়নি বা কোনো দপ্তর প্রকাশ করেনি। এমনকি কংগ্রেস পর্যন্ত পুরো ঘটনা জানে না।

আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণের মধ্যে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পদচিহ্ন অব্যাহত রয়েছে।

স্টেফানি স্যাভেল, ‘যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি’ প্রকল্পের সহপরিচালক, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র

প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সাতটি দেশে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।

দেশগুলো হলো: লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইয়েমেন ও সোমালিয়া।

গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, ওই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাস দমনের সঙ্গে সম্পর্কিত

১২টি দেশে যুদ্ধ বা সম্ভাব্য যুদ্ধে জড়িত ছিল। তখন তারা অন্তত আটটি দেশে অত্যন্ত

গোপনীয় ১২৭ই কর্মসূচি পরিচালনা করে। দেশগুলো হলো মালি, তিউনিসিয়া, ক্যামেরুন,

কেনিয়া, লিবিয়া, নাইজার, নাইজেরিয়া ও মৌরিতানিয়া। ১২৭ই কর্মসূচির আওতায়

মার্কিন সামরিক বাহিনী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে স্থানীয় বাহিনীকে ব্যবহারের সুযোগ পায়।

ওই সময়ে (২০১৮-২০) যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনাবাহিনী, পররাষ্ট্র দপ্তর বা অন্যান্য

সংস্থা দিয়ে ‘সন্ত্রাস’ দমনে ৭৯টি দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও নানা ধরনের সহযোগিতা করেছে।

স্যাভেল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণের মধ্যে শুরু

হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পদচিহ্ন অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, পেন্টাগন পরাশক্তির ক্ষমতার প্রতিযোগিতার দিকে নজর ঘোরালেও তাদের এই যুদ্ধ শেষ হয়নি।

আরও আপডেট নিউজ জানতে ভিজিট করুন